Apan Desh | আপন দেশ

কবিতার দুর্বোধ্যতা বনাম পাঠকের ঘাম

অলোক আচার্য

প্রকাশিত: ১৩:১২, ১৯ মে ২০২৪

আপডেট: ১২:৫৮, ২১ মে ২০২৪

কবিতার দুর্বোধ্যতা বনাম পাঠকের ঘাম

ফাইল ছবি

Poetry is when an emotion has found its thought and the thought has found words- রবার্ট ফ্রস্টের কথায় এই ইংরেজিটুকুর বাংলা করলে দাড়ায়- কবিতা হলো যখন একটি আবেগ তার চিন্তা খুঁজে পেয়েছে এবং চিন্তা শব্দ খুঁজে পেয়েছে। সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কবিতা। অর্থাৎ কবিতা হলো সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ।

সাহিত্য যদি একটি মানুষের শরীর হয় তাহলে কবিতা হলো তার প্রধান অংশ। কবিতা লেখা বা কবি হওয়া সহজ কথা নয়। যদিও বাস্তবতা হলো দেশে কবি এবং কবিতার সংখ্যাই বেশি। সাহিত্যের অন্য অংশগুলোর লেখা হয় তার তুলনায় খুবই কম। প্রতি বছর বইমেলায় কবিতার বই সবচেয়ে বেশি এসেছে বিপরীতে কবিতার বইয়ের বিক্রি সবচেয়ে কম। এবারেও তাই হয়েছে। এসব খবর এখন আর অবাক করে না। কারণ গত কয়েক বছর ধরেই কবিতার বাজারের এই হাল! কেন এই হাল হয়েছে বা কবিতার ভবিষ্যতই বা কি সেই উত্তর আদৌ কারো কাছেই নেই।

একটু খোঁজ নিলেই জানা যাবে কবিতার বই অধিকাংশই তৈরি হয় কবির পকেটের টাকা খরচ করেই! প্রকাশকরাও কবিতার বই এবং নতুন কবি হলেই বই প্রকাশে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। অজুহাত একটাই কবিতার বইয়ের বিক্রি কম। হাতেগোণা কয়েকজন কবি যারা সুপরিচিত হয়েছেন তাদের বইয়ের বাইরে পাঠক কবিতার বই কিনছেন কমই! আর যেখানে ব্যবসার প্রশ্ন সেখানে প্রকাশক কেনই বা কবিতার বই প্রকাশের ঝুঁকি নিবেন? অথচ প্রতি সপ্তাহে দেশের অর্ধশতাধিক দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিতভাবে প্রচুর সংখ্যক কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে।

একজন কবির একাধিক কবিতাও দেখা যায়। বইমেলায় সেই কবিই আবার পকেটের টাকা দিয়ে কবিতার বই প্রকাশ করেন! প্রশ্ন হলো সারাবছর এই যে কবিতা লেখা হলো তার জন্য একটি পাঠক শ্রেণি কেন তৈরি হলো না? এই ব্যর্থতা কি কবি নিবেন? কবিতার পাঠকের আবেগ সৃষ্টিতে কবি কি ব্যর্থ হচ্ছেন? কবিতার উৎপত্তি আবেগ থেকে। আবেগ হলো সেই অংশ যা আমাদের ভেতরের সত্ত্বাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

কয়েকটি শব্দে একটি গভীর অংশের উপস্থাপনায় কবিতার বিকল্প নেই। কবি ও কবিতার সম্পর্ক হৃদয় আর স্পন্দনের মতো। কবিতা নিজেই আলোড়িত হয়, আলোড়িত করে। নাড়া দেয় মানব মনের ভেতর থেকে ভেতরে। কবিতার নিজস্ব ভাষাও রয়েছে। কখনো তা যুদ্ধের, কখনো প্রেমের আবার কখনো তা দ্রোহের। জীবনের দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতার উপাদান খুঁজে নেয় কবি। উইকিপিডিয়ায় পাওয়া যায়, কবি সেই ব্যক্তি বা সাহিত্যিক যিনি কবিত্ব শক্তির অধিকারি এবং কবিতা রচনা করেন। একজন কবি তার রচিত ও সৃষ্ট মৌলিক কবিতাকে লিখিত বা অলিখিত উভয়ভাবেই প্রকাশ করতে পারেন।

আরও পড়ুন <> আওয়ামী লীগের প্রতি নির্মলেন্দু গুণের আক্ষেপ

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে কবিতায় এখন যুক্ত হয়েছে দুর্বোধ্য শব্দের ব্যবহার। প্রচুর কবিতা লেখা হচ্ছে তার অর্থ সহজে পাঠকরা বুঝতে পারছেন না। যদি কবিতার অর্থ বোধগম্য নাই হয় তাহলে পাঠক তা পাঠ করবেন কেন? পাঠকের কি এমন দায় পরেছে যে সব ছেড়ে দিয়ে দুর্বোধ্য কবিতার অর্থ খোঁজা নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন? অথচ বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবিগণও কিন্তু কবিতায় দুর্বোধ্য শব্দের ব্যবহার করেছেন কমই। তাদের কবিতার ভাবার্থ ছিল গভীর। সেটি হতেই পারে। সেটিই হওয়া উচিত। তবে শব্দের দুর্বোধ্যতা আশা করা যায় না।

অথচ সেটিই হচ্ছে। সত্যি কথা বলতে, এই যে কবিতার পাঠক নেই এর পেছনে এইসব কবিগণকেও দায় নিতে হবে। তারা কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না। সমসাময়িক সময়ের ওপার বাংলার কবিরাও এতটা দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার করে কবিতা লিখছেন না। অথচ আমাদের দেশে এটাই এখন স্টাইল! যে যত বেশি দুর্বোধ্য কবিতা লিখবেন তিনি তত বড় মাপের কবি! এই যদি হয় অবস্থা তাহলে পাঠকের আর দোষ কোথায়!

বাংলা ভাষার আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। এই যে কবি বললেন, সকলেই কবি নন, কেউ কেউ কবি এখানেই স্পষ্ট যে যারা কবিতা লেখার মতো দুরুহ কাজটি করছেন তারা সকলেই কবি হতে পারছেন না, কবির সংখ্যা হাতে গোণাই! কারো নামের আগে, সাইনবোর্ডে কবি যোগ করতে দেখা যায়। সাহিত্যে কবিতার তুলনায় গদ্য চর্চার সংখ্যা একেবারেই হাতে গোণা। সাহিত্য সম্পাদকদের কাছে কবিতার চেয়ে গদ্যের চাহিদা প্রচুর।

অবস্থা এমন যে কবিতা পাঠালে তা বাছাই করতেই সাহিত্য সম্পাদকের ঘাম ছুটে যায়। মেইলে শত শত কবিতা জমা থাকে। কিন্তু তার তুলনায় গল্প বা কোনো গদ্য জমা থাকে খুবই কম। এতেই বোঝা যায় যে বাজারে কবিতার অবস্থা ভালো না হলেও কবির অবস্থা ভালো। এই যে কবিতার পাঠক শ্রেণি নিষ্প্রাণ হয়ে যাচ্ছে, তার দায় আসলে কার? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামের যুগ পার দিয়ে বাংলা কবিতায় পরিবর্তন আনেন জীবনানন্দ দাশ।

এরপর বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য কবিরা হলো শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, মহাদেব সাহা, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহসহ আরো কয়েকজন। এরা এখনো কবিতার প্রতিনিধিত্ব করছেন। একেবারে মফস্বল পর্যায়েও শিক্ষার্থীরা এসব কবির নাম জানেন এবং তাদের কবিতা পড়েন। কিন্তু হালে যারা কবিতার প্রতিনিধিত্ব করছেন তাদের কতজনের কবিতা একেবারে মফস্বল পর্যন্ত যাচ্ছে বা পঠিত হচ্ছে?

নিয়মিত যেসব কবি কবিতা লিখছেন বা ভবিষ্যত কবিতা যাদের কলমে বলে স্বীকার করছি তাদেরও কতজন পাঠকের হৃদয়ে দাঁগ কাটতে পারছেন তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছেন। কবিতার পাঠক কমার পেছনে তাহলে কবিদেরও দায় রয়েছে। এটি বোধ করি কবিও অস্বীকার করতে পারেন না। বর্তমান সময়ে দেশে বিদেশে প্রচুর বাঙালি সাহিত্য চর্চার এই গুরুত্বপূর্ণ অংশ কবিতা নিয়ে চর্চা করছেন। কবিতা চর্চা এবং কবিতা পাঠের মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করা এই দুইয়ের ভেতর পার্থক্য থেকে যাচ্ছে। পাঠকের পক্ষ থেকে প্রায়ই একটি অভিযোগ পাওয়া যায় কবিতা নিয়ে। তাদের অভিযোগ এ সময়ের কবিতায় অযথাই কঠিন শব্দের প্রয়োগ হচ্ছে। কবিতা বোধগম্য হতে একটি বেশিই কষ্ট হচ্ছে। এ অভিযোগ যে একেবারে অমূলক নয় সেটি সমসাময়িক কবিতায় পড়লেই বেশ বোঝা যায়। কবিতা হোক বা প্রবন্ধ হোক বা অন্যকিছু হোক যদি তা সহজে বোঝা না যায় তাহলে তা স্বার্থক সাহিত্যের কাতারে পরে না।

কবিতার গতি প্রকৃতির যারা খোঁজ রাখেন তারাও এটা স্বীকার করবেন। অথচ আমরা যাদের কবি হিসেবে আদর্শ মানি সেই জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদরা কিন্তু কবিতায় কাঠিন্য আনেননি। কবিতা পড়ার সাথে সাথে তার অর্থ বুঝতে যদি বহু সময় পার হয়ে যায় তাহলে তার পেছনে আর সময় ব্যয় করবে কেন? এখন প্রশ্ন হলো কবিতা যদি এভাবে কাঠিন্যের দিকে ধাবিত হয় তাহলে পাঠকের বিমুখতা তৈরি হবে এবং তা কবিতার জন্য ভালো নয়।

যদিও কবিতার ঢং যার যার নিজস্ব। কিন্তু শব্দগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটু সহজবোধ্যতা আশা করতেই পারে পাঠকসাধারণ। আজকাল কবিতা প্রকাশের মাধ্যম বহু। এর মধ্যে কোনটি কবিতা হচ্ছে আর কোনটি কবিতা হচ্ছে না সেটিও বিচার করার কেউ নেই। ইচ্ছে হলেই তা প্রকাশ করা যায়। অন্তত সেক্ষেত্রে ফেসবুক তো রয়েছেই। কবি হতে চাওয়া কোনো অপরাধ নয়। তবে কবিতা লিখতে হলে আগে কবিতা প্রচুর পড়তে হয় এই তত্ত্ব হালের অনেকেই হারিয়ে বসেছেন।

একজন কবি প্রতিদিন একের অধিক কবিতাও লিখছেন! প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি কবিতা লেখা এতটাই সহজ? যাদের কবিতা আমরা আদর্শ মানি তারাও কি এত এত কবিতা লিখতেন? অকবিতা নিয়ে আজকাল নানামুখী আলোচনা চোখে পরে। কবি কবিতা এসব নিয়ে সাহিত্যিকরা বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ব্যাখ্যা দেন। এসব ব্যাখ্যার কোন কোন অংশ বুঝতে পারি আবার কোনো কোনো অংশ বেশ দুর্বোধ্য বলে মনে হয়। দুর্বোধ্য সম্ভবত আমার অজ্ঞানতার কারণেই। একটি চিত্র যেমন সবাই বুঝে উঠতে পারে না তেমনি একটি কবিতাও সবার বোধগম্য হয় না। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে কবির কবিতা বোঝা যত দুঃসাধ্য কাব্যের মাপকাঠিতে সেটি তত ভারী! অথচ সত্যি হলো কবিতার দুর্বোধ্য হলে পাঠক তা এড়িয়ে যায়। কবিতা যদি কারও আবেগকে টানতে না পারে তাহলে আর কবিতার সার্থকতা কোথায় থাকে।

এই যে বনলতা সেনরা সৃষ্টি হয়েছে সে কি এমনি এমনি হয়েছে। কাব্য বোঝার মতো শব্দঘর আমর ভেতর তৈরি হয়নি। আজকাল কবিতা প্রকাশের সুযোগ বা ক্ষেত্র অনেক বেশি। দেশে হাজারের উপরে জাতীয়, আঞ্চলিক পত্রিকা রয়েছে। দৈনিক পত্রিকার পাশাপাশি রয়েছে সাপ্তাহিক, মাসিক বা ত্রৈমাসিক পত্রিকা। এসব পত্রিকার রয়েছে সাহিত্য পাতা। এসব সাহিত্য পাতায় নিয়মিত কবিতা লিখছেন তরুণ কবিরা।

মূলত নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি। এতসব মাধ্যমের ভিড়ে কবিদের নিয়ে নানা সমালোচনাও চোখে পরে। রবীন্দ্র যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক গদ্য কবিতার যুগ পর্যন্ত বহৃ কবি কবিতা লিখতে চেষ্টা করে গেছেন। তবে কবি হয়ে টিকে আছে কতজন? নতুন নতুন কবি আসবে, তাদের হাত ধরে কবিতাও আসবে। তবে মানের দিকটা একটু নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কবিতার গতিপথ নির্ধারিত হতে মানসম্মত কবিতার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আপন দেশ/এমআর

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

জনপ্রিয়