Apan Desh | আপন দেশ

সোজাসিধা

হবু-গবু একাকার: সবদিক ছারখার

মোস্তফা কামাল

প্রকাশিত: ০০:৫৫, ২০ আগস্ট ২০২২

আপডেট: ২৩:৩০, ২২ আগস্ট ২০২২

হবু-গবু একাকার: সবদিক ছারখার

ছবি: আপন দেশ ডটকম

বেহেশত বিষয়ক মুখপাণ্ডিত্যের রেশ কাটতে না কাটতেই আরেক অ্যাপিসোড নিয়ে হাজির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। জানিয়েছেন, ভারত সফরে গিয়ে শেখ হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখতে দিল্লীর সবধরণের সহায়তার অনুরোধ করা হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে চট্টগ্রামে পূজা উদযাপন পরিষদ নেতাদের জানিয়েছেন এ তথ্যটি। তাও অনরেকর্ডে। ক্যামেরার সামনে। 

উজির-নাজির, মন্ত্রী, নেতা, আতিপাতিদের নিয়ে কতো রসগল্প রয়েছে এ দেশে। হবুচন্দ্র- গবুচন্দ্র মন্ত্রীদের লাগামহীন কথাবার্তা ও কাণ্ডকীর্তি রয়েছে আমাদের পাঠ্যসুচিতে। গত কয়েক বছরে সব ছাড়িয়ে গেছেন বাংলাদেশের মন্ত্রীরা।প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গিয়ে এটাসেটা বলা তাদের অনেকটা ঐতিহ্যের মতো। যে কারণে অপজিশনে থাকার সময় সুবোধ-সজ্জন ব্যক্তিটিও সরকারে গিয়ে তালবেতাল হয়ে যান। খেই হারিয়ে মন যা চায় তা-ই বলে বেড়ান। তা কখনো ক্ষমতার জোশে, কখনো হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে। আবার কখনো কখনো আরেক সহকর্মীকে টেক্কা দিতে গিয়ে। এসব করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে সরকারের বা নিজের বিরুদ্ধেও বলে ফেলছেন। পরিস্থিতি বেগতিক হয়ে গেলে দোষ দেন জিহ্বার। বলেন, স্লিপ অব টাং হয়েছে। গোলমালটা আসলে তাদের নিজেন না জিহ্বার, মানুষ প্রশ্নবিদ্ধ। 

এ ধারাবাহিকতায় প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর জন্য এমন এক দোয়া করেছেন যা আওয়ামী লীগ বা বঙ্গবন্ধুর জাতশত্রুরাও করে না। ‘আল্লাহ যেন বঙ্গবন্ধুকে জাহান্নামের ভালো জায়গায় স্থান করে দেন’- সবাইকে এ দোয়া করার প্রতিমন্ত্রী স্যোশাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভাইরাল হয়। তিনি অবশ্য জিহ্বা বা ঠোঁটের দোষ দেননি। দায়ী করেছেন মনকে। বলেছেন, জান্নাত আর জাহান্নামের তফাৎ তার মনে ছিল না। 

তাদের  মন-জিহ্বা এতো ডিসঅর্ডার কেন? বেশি মোজ-মাস্তিতে? নাকি প্যানিকে? গত টানা ১৪ বছরে কাজকর্মে সরকার এতো বেকায়দায় পড়েনি, যতো নাকানিচুবানি খেয়ে চলছে একেক উজিরের মুখদোষে। এমন এমন উদ্ভট-উৎকট কথা তারা ছোঁড়েন যেগুলোর সংকলন দিয়ে বিশাল গ্রন্থ হতে পারে। যা পড়ে তখনকার প্রজন্ম জানবে, একদা এদেশে এই কিছিমের কিছু মন্ত্রী ছিলেন।

‘বহু দেশের মানুষেরই বিমানে চড়ার সামর্থ নেই, সেখানে আমরা প্লেনে করে পিঁয়াজ নিয়ে আসি’ মর্মে দেয়া বক্তব্যটি একজন মন্ত্রীর। বিদেশের মন্ত্রীরা এখন বাংলাদেশের মন্ত্রীদের অ্যাপোয়েন্টমেন্টের জন্য বসে থাকে, ঢাকার টয়লেটগুলো ফাইভস্টার হোটেলের মতো, হাতিরঝিল গেলে মনে হয় প্যারিস শহর, আকাশ থেকে ঢাকা

শহরকে মনে হয় লসঅ্যান্জেলস, আগামীতে টেমস নদী দেখতে লন্ডন নয়, বুড়িগঙ্গা গেলেই হবে, দেশে চালের কোনো সংকট নেই, গরুও এখন ভাত খায়, গরু কচুরিপানা খেতে পারলে মানুষ কেন তা খেতে পারবে না- এই কিছিমের হেন কুকথা নেই যা তাদের মুখ দিয়ে বের না হচ্ছে।

মানুষের গায়ে কাপড় আছে মানে দেশের অবস্থা ভালো- এ ধরনের মন্তব্য করা সম্ভব মানসিক সমস্যা কোন পর্যায়ে গেলে?  ‘মানুষ এখন ৩ বেলাই মাংস খেতে পারে’-এমন বচনও দিয়েছেন একমন্ত্রী। করোনায় হাজারে-হাজার মানুষের মৃত্যসহ আক্রান্ত শনাক্তের সময় একজন বলে দিলেন, ‘আমরা করোনার চেয়েও শক্তিশালি’। ডেঙ্গুর প্রকোপের সময় আরেকজন বললেন, দেশের উন্নয়ন হতে থাকায় ডেঙ্গু এসেছে।

এই মন্ত্রী যানজটকে বলেছেন, উন্নয়নের প্রমাণ। সরকার কোনো সমস্যাকেই হালকাভাবে নিয়েছে বা সমাধানের চেষ্টা করেনি বলে নিষ্কণ্টক প্রমাণ নেই। গত দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশ ভুগছে করোনার মতো ভয়ঙ্কর বিশ্বমহামারীতে। এরপর রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ। বিশ্বমন্দা ও উত্তেজনায় ডলার ক্রাইসিস। এর পূর্বাপরে বা মাঝপথে বন্যা, খরাসহ কতো দুর্যোগ। বড় কঠিন সময় পার করছে দেশের প্রতিটি সেক্টর। তা উৎরানোর চেষ্টায় কমতি করছে না সরকার। এই চেষ্টাপথে মন্ত্রী-নেতাদের কারো কারো অযথা-অহেতুক মুখপণ্ডিতি সরকারকে আরো বেকায়দায় ফেলছে।  

কেবল সরকারকে নয়, মাঝেমধ্যে তারা প্রধানমন্ত্রীর সম্মান নিয়েও টান দিচ্ছেন। নিজেদের মুখপাণ্ডিত্য জানান দিতে গিয়ে টেনে আনছেন প্রধানমন্ত্রীকেও। অকারণে-অপ্রাসঙ্গিকভাবেও প্রধানমন্ত্রীর স্তুতি গাইতে গিয়ে তাকে ঠেলে দিচ্ছেন অসম্মানের জায়গায়। হেভিওয়েট একজন মন্ত্রী বলে দিলেন, দেশের এ সঙ্কটে মানুষের কষ্টের কথা ভেবে প্রধানমন্ত্রীরাতে নির্ঘুম থাকেন। কী বোঝালেন তিনি? নিজে জোকার হয়ে গেছেন তো প্রধানমন্ত্রীকেও সেই তালিকায় নিতে হবে? প্রধানমন্ত্রী কম ঘুমান-তথ্যটি প্রতিষ্ঠিত। তিনি নিজমুখেও জানিয়েছেন এ কথা। গণমাধ্যমের কাছেই বলেছিলেন, ‘মাত্র ৫ ঘণ্টা ঘুমাই, বাকি সময় দেশের কাজ করি’। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তার অবস্থা জানান দেয়ার পর এ নিয়ে অন্য কারো কি আর কিছু জানান দেয়া জরুরি? 

জানা বিষয় বেশি বেশি জানানোর চেষ্টা শোভন নয়। উজির-নাজির হলেই বুঝি উল্টাসিধা বলতে হয়? নাকি উল্টাসিধা বললে উজির-নাজির হওয়া যায়?-এমন টাইপের নিস্পত্তিহীন কিছু প্রশ্ন ঘুরছে বিবেকমানদের কাছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার মন্ত্রীসহ দলের নেতাদের বুঝেশুনে কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন। সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আবারও দায়দায়িত্বহীন কথা না বলার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বেহেশত বিষয়ক বাহাদুরির পর। এরপরও মুখজোরের চর্চা থামার লক্ষণ না থাকার মতো। 

 

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন  

 

(আপন দেশ ডটকমের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের আপন কথার মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার আপন দেশ ডটকম নিবে না।)

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

জনপ্রিয়