Apan Desh | আপন দেশ

বিশ্বশান্তি ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের মূলনীতি

কানাই চক্রবর্তী

প্রকাশিত: ১৩:১৩, ২২ মে ২০২৩

আপডেট: ১৪:৩৪, ২৩ মে ২০২৩

বিশ্বশান্তি ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের মূলনীতি

ছবি : আপন দেশ

বিশ্বশান্তি ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের মূলনীতি। তিনি ছিলেন বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, বঞ্চিত ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ বিশ্বের যে প্রান্তেরই হোক না কেন, তিনি তাদের সঙ্গে একাত্ম ছিলেন।

ছাত্রাবস্থা থেকেই বিশ্বশান্তিতে বঙ্গবন্ধুর আগ্রহ ছিল প্রবল। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে দীর্ঘদিন কারাভোগ করে মুক্তি পেয়ে ওই বছরের (১৯৫২) অক্টোবরে চীনে অনুষ্ঠিত ‘পিস কনফারেন্স অব দ্য এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক রিজিওন্স’-এ যোগ দেন বঙ্গবন্ধু। এই সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি প্রাসঙ্গিকভাবে অন্য ৩৭টি দেশ থেকে আগত শান্তিকামী নেতাদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘আমার দেখা নয়াচীন' গ্রন্থে এ সম্মেলনের বিশদ বিবরণ রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু লিখেছেন ‘হঠাৎ সেপ্টেম্বর মাসে আমন্ত্রণ এলো পিকিং এ শান্তি সম্মেলনে যোগদান করতে হবে। পাকিস্তান শান্তি কমিটি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। পূর্ব বাংলা থেকেও কয়েকজনকে যেতে হবে। ৩৭টি দেশ এতে যোগদান করবে। অনেকে বলতে পারেন, কম্যুনিস্টদের শান্তি সম্মেলনে আপনারা যোগদান করবেন কেন? আপনারাতো কম্যুনিস্ট না।  কথাটা সত্য যে আমরা কম্যুনিস্ট না। তথাপি দুনিয়ায় আজ যারাই শান্তি চায়, তাদের শান্তি সম্মেলনে আমরা যোগদান করতে রাজি। রাশিয়া হউক, আমেরিকা হউক, ব্রিটেন হউক, চীন হউক যে-ই শান্তির জন্য সংগ্রাম করবে তাদের সাথে আমরা সহস্র কন্ঠে আওয়াজ তুলতে রাজি আছি আমরা শান্তি চাই। কারণ, যুদ্ধে দুনিয়ার যে ক্ষতি হয় তা আমরা জানি ও উপলব্দি করতে পারি। বিশেষ করে আমার এ দেশে-যে দেশকে পরের দিকে চেয়ে থাকতে হয়, কাঁচামাল চালান দিতে হয়। যে দেশের মানুষ না খেয়ে মরে, সামান্য দরকারি জিনিস জোগাড় করতে যাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে, সে দেশে যুদ্ধ যে কতখানি ক্ষতি হয় তা ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের কথা মনে করলেই বুঝতে পারবেন। কোথায় ইংরেজ যুদ্ধ করেছে তার জন্য আমার দেশের ৪০ লক্ষ লোক শৃগাল কুকুরের মতো না খেয়ে মরেছে।’ (আমার দেখা নয়াচীন, পৃষ্টা ১৯)

বঙ্গবন্ধু নিজের জীবনে একটি বিশ্বযুদ্ধ (দ্বিতীয়) এবং এর প্রতিক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেছেন। সে সময় তিনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দুস্থ ও অনাহারীদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে গেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেছেন, ‘আমরা চাই, অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যয়িত অর্থ দুনিয়ার দুঃখী মানুষের কল্যাণের জন্য নিয়োগ করা হোক। তাহলে পৃথিবী থেকে দারিদ্র্যের অভিশাপ মুছে ফেলার কাজ অনেক সহজসাধ্য হবে। বিশ্বরাজনীতিতে তখন প্রত্যক্ষ দুটো ব্লক ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। তা ছাড়া ছিল সামরিক  জোটও। বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘আমরা সর্বপ্রকার অস্ত্র প্রতিযোগিতার পরিবর্তে দুনিয়ার সকল শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে বিশ্বাসী বলেই বিশ্বের সব দেশ ও জাতির বন্ধুত্ব কামনা করি। সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এই নীতিতে আমরা আস্থাশীল।’

পরে  ১৯৫৬ সালের ৫–৯ এপ্রিল স্টকহোমে বিশ্বশান্তি পরিষদের সম্মেলনেও অংশ নেন বঙ্গবন্ধু। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিশ্বশান্তি আমার জীবনের মূলনীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যেকোনো স্থানেই হোক না কেন, তাদের সঙ্গে আমি রয়েছি। আমরা চাই বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।’

বস্তুত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শান্তিকামী মানুষের লড়াই আর বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই শান্তির লড়াইয়ের প্রধান নেতা। বিশ্ব শান্তি যে তার আরাধ্য ছিল দেশ স্বাধীনের পরপরেই তিনি তা মনে করিয়ে দিতে ভুল করেননি। পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পা রাখেন। লন্ডন থেকে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে যাত্রা বিরতিতে ছিল বিপুল সংবর্ধনার আয়োজন। সেখানে তিনি বলেন, ‘বিজয়কে শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে রূপান্তরিত করার যে গুরুদায়িত্ব আমার জনগণের সামনে পড়ে আছে সেই দায়িত্বপালনে জনগণের সঙ্গে যোগদানের জন্য আমি ফিরে যাচ্ছি।’

 বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং সর্বাত্মক প্রতিরোধের আহ্বান জানান যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ট্যাঙ্ক, কামান, মেশিনগান ও রাইফেল নিয়ে নিরস্ত্র নারী-পুরুষ-শিশুদের হত্যার জন্য অভিযান শুরু করে।

শান্তির জন্য ব্যাকুলতা  ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের অপরিহার্য অংশ। একারণে রাজনৈতিক লক্ষ অর্জনের জন্যও তিনি শান্তিপূর্ণ পথে অগ্রসর হয়ে চেয়েছিলেন। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে তিনি ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। কিন্তু তার হাতে ক্ষমতা না দিয়ে জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকাল স্থগিত ঘোষণা করে শুরু হয় কুখ্যাত অপারেশন সার্চ লাইট বাস্তবায়নের প্রস্তুতি। ১ মার্চ থেকেই পাকিস্তানি বর্বর আর্মি বাঙালিদের হত্যা করতে থাকে নির্বিচারে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শুরু করেন শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন।

বিশিষ্ট জনেরা মনে করেন, বাঙালির নিজস্ব স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ধারণা অনেক আগে থেকেই তিনি পোষণ করছিলেন। জাতীয় অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য এর বিকল্প নেই, সেটি যেমন বুঝেছিলেন, তেমনি বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এর অপরিহার্যতা তিনি উপলব্ধি করেন। পাকিস্তান পঞ্চাশের দশকেই যুক্তরাষ্ট্রের  সামরিক জোট সিয়াটো ও সেন্টো এবং পাক-মার্কিন সামরিক জোটে জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ সে সময়ে পাকিস্তানের অংশ এবং দুর্ভাগ্যজনক যে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের অশুভ আঁতাতের চরম খেসারত দিতে হয় বাঙ্গালীদের। পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে যুক্তরাষ্ট্র যে অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য দিয়েছে তা ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশে গণহত্যা পরিচালনার জন্য।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিরোধিতা করে বিশ্ব পরাশক্তির একাংশের যে অমানবিক অবস্থান, তার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বৃহৎ শক্তিবর্গ, বিশেষভাবে আগ্রাসীনীতির অনুসারী কতিপয় মহাশক্তির অস্ত্রসজ্জা, তথা অস্ত্র প্রতিযোগিতার ফলে আজ এক সংকটজনক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’

আলজেরিয়ায় ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করে উচ্চারণ করেন, পৃথিবী দুভাগে বিভক্ত, কিন্তু তিনি শোষিতের পক্ষে। তিনি দেশ বা বিদেশ যেখানেই মানবাধিকারের লঙ্ঘন দেখেছেন, মানুষের ন্যায্য স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার সংবাদ পেয়েছেন, সেখানেই প্রতিবাদ করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর এইসব চিন্তাধারা এবং শান্তির জন্য তার আহ্বান পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপি মূল্যায়ন হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আর্জন করেন ‘জুলিও কুরি’ পদক। এর আগে একাত্তর সালে এই অবিসংবাদিত নেতার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এর মাত্র দু’বছর পরে বিশ্বশান্তি পারষদ বঙ্গবন্ধুকে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই ‘জুলিও কুরি’ পদকে আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতি প্রদান করেন। সারা জীবনের দর্শন আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কত্বের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুকে এই জুলিও কুরি পদক প্রদান করা হয়।

বিশ্বশান্তি পরিষদ ১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর পদকপ্রাপক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর নাম ঘোষণা করে। আর পরের বছর ২৩ মে এশীয় শান্তি সম্মেলনের এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে এই পদক বঙ্গবন্ধুকে পরিয়ে দেন পরিষদের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল রমেশচন্দ্র। সেই অনুষ্ঠানে রমেশচন্দ্র বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার নন, তিনি বিশ্বের এবং তিনি বিশ্ববন্ধু।’ স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো রাষ্ট্রনেতার সেটিই ছিল প্রথম আন্তর্জাতিক পদক লাভ।

লেখক: সাংবাদিক, সিটি এডিটর, বাসস।

 

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

জনপ্রিয়