Apan Desh | আপন দেশ

ঘুষ দিলেই চাটমোহরের খাস জমি হয় ব্যক্তির

আলমগীর হোসাইন নাবিল, পাবনা

প্রকাশিত: ১৫:০২, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

আপডেট: ১৫:০৬, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ঘুষ দিলেই চাটমোহরের খাস জমি হয় ব্যক্তির

ছবি: আপন দেশ

পাবনার চাটমোহরে একের পর এক সরকারি জমির মালিকানা পাচ্ছে ব্যক্তি। এ অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত এসিল্যান্ড তানজিনা খাতুন। তার কর্মে দালাল হিসেবে মাঠে নেমেছে হান্ডিয়াল ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম। ঘুষের টাকা নিয়েছেন কখনো নগদে, আবার কখনো বিকাশে। তার ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে অর্থ পাঠানোর একাধিক প্রমাণও রয়েছে আপন দেশ’র হাতে।

ঘুষ নিয়ে সরকারি জমি খারিজ করে দিয়ে চাপে মুখে আবার সিদ্ধান্ত বাতিল করার ঘটনাও একাধিক। এসব নিয়ে জেলা প্রশাসক কাছে পড়েছে অভিযোগের স্তূপ। অবস্থা বেগতিক দেখে ঘুষ নিয়ে নামজারি করা খারিজ নিজেই বাতিলের আবেদন করেছেন সিরাজুল। ঘুষের টাকা বেহাত করতে তড়িঘরি বদলি হয়ে আরেক উপজেলার গেছেন।

স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক বছর ধরে জমিদারদের ফেলে যাওয়া হান্ডিয়ালের এসব খাস জমি দখলে নিতে মরিয়া একাধিক ভূমিদস্যু চক্র। আইনি প্রক্রিয়া ও কাগজপত্র ছাড়াই খাস জমি ব্যক্তির নামে নামজারি করে দিয়েছেন চাটমোহরের এসিল্যান্ড তানজিনা খাতুন। 

বাঘলবাড়ী মৌজায় ৯৬৬নং খতিয়ানে ১৬ দাগে কছিমউদ্দিন, ছকির উদ্দিন, আব্দুর রশিদ ও রমজান আলীসহ ১১ ব্যক্তির নামে সম্প্রতি খারিজ হওয়া ১৫ বিঘা জমির নথি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন আপন দেশ’র এ প্রতিনিধি।

আরও পড়ুন>> ধর্ষকের জরিমানা এক হাজার টাকা!

রেকর্ড রুমে সংরক্ষিত মূল নথি থেকে জানা যায়, ওই দাগের সকল জমিই ১নং খাস খতিয়ানের, যার মালিকানায় নাম বাংলাদেশ সরকার। কীভাবে এসব জমির মালিক বনে গেল তারা। জানতে সরেজমিনে হান্ডিয়ালের বাঘলবাড়ী গ্রামে গেলে জানা যায়, কেবল এ ১৫ বিঘাই নয়। গত এক বছরে সিরাজুল খাস খতিয়ানভুক্ত আরও কয়েকটি জমি, জলাশয় এসিল্যান্ডে মাধ্যমে ব্যক্তি নামে খারিজ করেছেন। 

কয়েকটি জমি নিয়ে স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলে গোপনে নামজারি বাতিলেরও আবেদন করেছেন তিনি। এছাড়া, ব্যক্তিগত পৈত্রিক সম্পত্তিও খারিজের জন্য স্থানীয়দের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। 

বাঘলবাড়ী গ্রামের সোনা উল্লাহ বলেন, সিরাজুল নায়েব হান্ডিয়ালে দায়িত্ব নেয়ার পর ঘুষ-দুর্নীতির আস্তানায় পরিণত হয় ইউনিয়ন ভূমি অফিস। জালিয়াতির মাধ্যমে রমজান, ছকিরউদ্দিন গংদের ১৫ বিঘা সরকারি জমি ১৫ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে ব্যক্তি নামে খারিজ করে দিয়েছেন। এসিল্যান্ড তানজিনা খাতুন কোন যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব জমি খারিজে অনুমোদন দিয়েছেন।

একই গ্রামের বৃদ্ধ হাসান আলী বলেন, তিন বিঘা পৈত্রিক জমি খারিজের জন্য তিনি গত এক বছরেরও বেশি সময় নায়েব সিরাজুল ইসলামের কাছে ঘুরেছেন। তার দাবি অনুযায়ী ২০ হাজার টাকা ঘুষ দেয়ার পরেও কাজ হয়নি। এখন আরও টাকা দাবি করছেন।

হান্ডিয়ালের নিমগাছী মৎসজীবী সমিতির সভাপতি মনিরুল ইসলাম আপন দেশ’কে বলেন, সরকারি খাস জলাশয় নিয়ম অনুযায়ী ইজারা নিয়ে সমিতির সদস্যরা সুবিধাভোগী হিসেবে মাছ চাষ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। কয়েক মাস আগে স্থানীয় নজরুল মেম্বার জলাশয় তার নামে খারিজ হয়েছে জানিয়ে মাছ ছাড়তে বাধা দেয়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, নায়েব ও এসিল্যান্ডকে ঘুষ দিয়ে নজরুল জলাশয়ের কয়েকটি দাগ নিজ নামে খারিজ করে নিয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিষয়টি ইউপি চেয়ারম্যানকে জানিয়েছি। তারা এখনো জলাশয়টি জোরপূর্বক জবর দখলের চেষ্টা করছে।

আরও পড়ুন>> পাবনায় শহিদ মিনারে মারামারি, নারী কর্মকর্তা লাঞ্ছিত

ওই গ্রামের পল্লী চিকিৎসক ইদ্রিস আলী বলেন, বাড়ি সংলগ্ন খাস খতিয়ানভুক্ত ১০৮ ও ১২১ দাগের ২৩ শতাংশ জমি সরকারি লিজ মানি দিয়ে ইজারা নিয়েছিলাম। ইজারা বাতিলের কথা বলে এসিল্যান্ড ও নায়েব কয়েক দফায় আমার কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছে। তারপরেও তারা ইজারা দেয়া জমি ব্যক্তি নামে খারিজ করে দিয়েছে। এখন জাল দলিল ও খারিজের বলে ভূমিদস্যূরা সরকারি জমি দখল নিতে চাইছে।

কীভাবে সরকারি জমি নিজ নামে নামজারি করেছেন জানতে চাইলে বাঘলবাড়ী গ্রামের রমজান আলী বলেন, সরকারি নয়, পৈত্রিক জমি আইনগত প্রক্রিয়ায় খারিজ করেছি। জমির দলিল আছে। এখন দলিল খুঁজে পাচ্ছি না। একপর্যায়ে, নায়েব ও এসিল্যান্ড জমি খারিজে সহযোগিতা করেছেন বলে স্বীকারও করেন তিনি। 

এদিকে গণমাধ্যমকর্মীরা বিষয়টি অনুসন্ধান করছে জানতে পেরে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধে কয়েকবার অর্থের প্রলোভন দেখান সিরাজুল ইসলাম। বলেন, দোতরফা সূত্রে রায় পাওয়ায় রমজান গংদের জমি খারিজের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। যেহেতু এটি নিয়ে আপত্তি এসেছে তাই বাতিলের আবেদনও করা হয়েছে। কিছু লোক নিজের স্বার্থস্বিদ্ধি করতে না পেরে অসত্য অভিযোগ করছে।

এদিকে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এসিল্যান্ড তানজিনা খাতুন। বলেন, অভিযোগ হলেই সবকিছু সত্য হয়ে যায় না। তারা প্রমাণ দেখাক। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।

পাবনা জেলা প্রশাসক মু. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকারি জমি ব্যক্তি নামে নামজারির সুযোগ নেই। তদন্তে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জালিয়াতিতে ভূমি কর্মকর্তারা জড়িত থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

উল্লেখ্য, চাটমোহর উপজেলার চলনবিল পাড়ের প্রাচীন জনপদ হান্ডিয়াল। মুঘল আমলে এখানে ছিলেন সম্রাট আকবর নিযুক্ত সুবাদার, থাকতেন ৫ হাজার সেনাও। ব্রিটিশ আমলে ১৮৪৫ সালে প্রশাসনিক থানার মর্যাদা পায় হান্ডিয়াল। দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে হিন্দু জমিদার ও ভূমি মালিকেরা ভারতে চলে যান। 

স্বাধীনতার পর তাদের সম্পদের দাবিদার না থাকায় তা সরকারের ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত হয়। সরকারের নিকট থেকে ইজারা নিয়ে আবার অনেক ক্ষেত্রে বন্দোবস্ত ছাড়াই এসব জমিতে চাষবাস করে আসছিলেন স্থানীয়রা। জলাশয়গুলোর বেশ কিছু স্থানীয় মৎসজীবী সমিতির সদস্যরা সুবিধাভোগী হিসেবে ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করেন।

আপন দেশ/এবি/এসএমএ

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

জনপ্রিয়